কোয়েল পালন হতে পারে শখ, পেশা এবং আত্নকর্মসংস্থান

হাঁস-মুরগী পালনের মত কোয়েল পালনও বর্তমানে বাংলাদেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছে । অনেক জেলাতেই বর্তমানে কোয়েল ফার্ম গড়ে উঠেছে। পোল্ট্রি পালনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অনায়াশেই কোয়েল পালন করা যায় এবং লাভজনক হওয়া যায়। বাংলাদেশ পশুসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (Bangladesh Livestock Research Institute (BLRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (BAU) পোল্ট্রি বিজ্ঞানীগণ কোয়েলের বিভিন্ন বিষয় গবেষণা করে পর্যবেক্ষণ করেছেন৷ এদেশের আবহাওয়া বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোয়েল পালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তাছাড়া অর্থনৈতিক ভাবেও কোয়েল পালন অত্যন্ত লাভজনক। ইতিমধ্যেই কোয়েলের মাংস ও ডিম সারা দেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কোয়েলের মাংস ও ডিম অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর এবং কোয়েল পালনের খরচ, যায়গার পরিমান ও ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় অনেকেই কোয়েল পালনকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন। কোয়েল হতে পারে ব্রয়লার এর বিকল্প কর্মসংস্থান।

কোয়েল পাখি

কোয়েল পালনের সুবিধাঃ
১। কোয়েলের মাংস ও ডিম সারা দেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কোয়েলের মাংস ও ডিম অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ।
২। কোয়েল পালনের খরচ, যায়গার পরিমান ও ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
৩। এরা আকৃতিতে ছোট বলে সহজেই আবদ্ধাবস্থায় এবং অল্প জায়গায় বেশী সংখ্যাক কোয়েল পালন করা যায়।
৪। যে-কেউ অল্প পুঁজিতে ছোট খাটো খামার দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে পারে কিংবা স্বল্প পরিসরে পারিবারিকভাবেও কোয়েল পালন করে নিজেদের পরিবারের ডিম ও মাংশের চাহিদা পূরণ করতে পারে।
৫। কোয়েল পালন করে স্বনির্ভর কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে বেকার সমস্যার কিছুটা সমাধান করা যায়।
৬। কোয়েলের রোগব্যাধি খুব কম এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও অন্যান্য পোল্ট্রির তুলনায় অত্যন্ত বেশী।
৭। মাত্র ৫ সপ্তাহের মধ্যে (জাপানী কোয়েল) এবং ৮ সপ্তাহের মধ্যে ববহোয়াইট কোয়েল) পূর্ণতা লাভ করে এবং মাংসের জন্য ব্রয়লার কোয়েল বাজারজাত করার উপযুক্ত হয়। ৬-৭ সপ্তাহের মধ্যে (জাপানী কোয়েল) এবং ৮-১০ সপ্তাহের মধ্যে (ববহোয়াইট কোয়েল) ডিমপাড়া শুরু করে। প্রতিটি জাপানি ও ববহোয়াই কোয়েলী বছরে যথাক্রমে ২৫০৩০০ ও ১৫০-২০০ টি ডিম দিয়ে থাকে।

লেয়ার কোয়েল ও ব্রয়লার কোয়েলঃ
১. লেয়ার কোয়েলঃ লেয়ার কোয়েল খামার ডিম উত্পাদনের জন্য পালন করা হয়৷ সাধারণত ৬-৭ সপ্তাহ বয়স থেকে জাপানী কোয়েলী এবং ৮-১০ সপ্তাহ বয়স থেকে ববহোয়াইট কোয়েলী ডিমপাড়া শুরু করে৷ ব্যবস্থাপনা সঠিক হলে প্রতিটি জাপানী কোয়েলী বছরে ২৫০-৩০০টি এবং ববহোয়াইট কোয়েলী ১৫০-২০০টি ডিম পেড়ে থাকে। লেয়ার খামারে সাধারণত ৫৪ সপ্তাহব্যাপী কোয়েলী পালন করা হয়৷
২. ব্রয়লার কোয়েলঃ নরম ও সুস্বাদু মাংস উত্পাদনের জন্য কোয়েলী নির্বিশেষে কোয়েলগুলোকে ব্রয়লার কোয়েল বলা যায়৷ মাংস উত্পাদনের জন্য জন্মের দিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত এবং ববহোয়াইট কোয়েলকে ৮ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত পালন করা হয়৷ এ সময়ের মধ্যে জীবিতাবস্থায় একেকটি পাখির ওজন হয় ১৪০-১৫০ গ্রাম এবং ওগুলো প্রায় ৭২.৫% খাওয়ার উপযোগী মাংস পাওয়া যায়।

কোয়েলের ঘর নির্মাণ ও কয়েকটি ঘর সম্পর্কে কিছু ধারণাঃ
১। পাখিদের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত এবং প্রাকৃতিক আলো-বাতাস নিশ্চিত করা ও প্রয়োজন মতো তা কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
২। অতিরিক্ত শীত, গরম বা বৃষ্টি ও স্যাঁতসেঁতে অবস্থা থেকে কোয়েল পাখি রক্ষার জন্য ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৩। বিভিন্ন বয়সের কোয়েলের জন্য পৃথক ঘরের ব্যবস্থা করা।
৪। ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষতিকারক জীব-জন্তুর হাত থেকে এদের রক্ষা করতে হবে।
৫। খামারে পাখির মল-মূত্রের কারণে যে কোন দুর্গন্ধ না হয়, সেজন্য আগে থেকেই সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

কোয়েল পালনের উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি (ডিম ও মাংসের জন্য) করে এদের ঘর বিভিন্ন প্রকার হতে পারে, যেমন-
১। হ্যাচারী ঘর (Hatchery) : এ ধরনের ঘরে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানো হয়।
২। ব্রডার ঘর (Brooder House): এখানে সদ্য ফোটা বাচ্চাদের জন্মের পর থেকে ২/৩ (বা অবস্থাভেদে ৩-৪) সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত কৃত্রিমভাবে তাপ প্রদানের মাধ্যমে পালন করা হয়।
৩। গ্রোয়ার ঘর (Grower house) : এখানে ৩-৫ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত বাচ্চা কোয়েলকে পালন করা হয়।
৪। ডিম পাড়া ঘর (Layer House) : এখানে ৬-৬০ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত ডিম উত্পাদনকারী কোয়েলগুলোকে পালন করা হয়।
৫। ব্রয়লার ঘর (Broiler House) : এখানে একদিন থেকে ৫ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত মাংস উত্পাদনকারী কোয়েলগুলোকে পালন করা হয়।
এই ঘর তৈরি ও পরিচালনার জন্য কয়েকদিনের প্রশিক্ষন দরকার হবে অথবা পরিচিত খামার পরিদর্শন করে টা আয়ত্ত করে নিতে হবে। অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নিলে ঝুকিমুক্তভাবে কোয়েল পালন করতে পারবেন।

কোয়েলের খাদ্য
কোয়েল খামারের মোট খরচের ৬০-৭০% ই খাদ্য বাবদ হয়। অন্যান্য পোল্ট্রির মতো কয়োলের খাদ্য তালিকায়ও ছয়টি পুষ্টি উপাদান (Feed nutrients), যেমন পানি (Water), শর্করা (Carbohydrates), স্নেহ পদার্থ (Lipids), আমিষ (Proteins), ভিটামিন (Vitamins), ও খনিজ পদার্থ (Minerals) থাকতে হবে৷ কোয়েল পালন থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ উত্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণে সবগুলো পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করতে হবে । তবে কোয়েলের খাদ্য তৈরি করতে পারেন অথবা এই চিন্তা আপনি বাদ দিতে পারেন, কারণ বাজারে বর্তমানে কোয়েলের জন্য রেডিমেড খাবার পাওয়া যায়। প্রতিটি পাখির জন্য বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য, পানি ও খাদ্যপাত্র সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
নিম্নমানের ফাঙ্গাস পড়া ভেজাল খাদ্য খাওয়ানো উচিত নয় এবং পরিস্কার খাবার ও পরিস্কার খাবার পাত্র নিশ্চিত করতে হবে। পাখিকে সব সময় পরিস্কার, বিশুদ্ধ পানি ও পানির পাত্র সরবরাহ করতে হবে। পানির পাত্র পরিস্কার করতে হবে। তবে খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নিলে ঝুকিমুক্তভাবে কোয়েল পালন করতে পারবেন এটাই করা উচিৎ।

সবার জন্য দরকার-
কোয়েল খামার থেকে পর্যাপ্ত উত্পাদন পেতে হলে প্রতিটি খামারীকে অবশ্যই খামার ব্যবস্থাপনার খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে৷ ছোটখাট যে-কোন অবহেলা বা ভুলত্রুটিই কোয়েল খামারের লোকসানের জন্য যথেষ্ট। কোয়েল ছাড়াও যেকোন খামার থেকে বাণিজ্যিকভাবে সাফল্য পেতে হলে চাই সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা। কোয়েল আকারে ছোট ও ওজনে কম হওয়ায় কম খায়, রোগব্যাধি কম এবং অল্প জায়গায় অধিক পালন করা যায়। তাছাড়া প্রারম্ভিক খরচ অত্যন্ত কম বিধায় যে-কেউ অল্প পুঁজিতে ছোট আকারের কোয়েল খামার দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে পারেন। যাইহোক কোয়েল পালন সম্পর্কে এখানে সামান্য ধারনা দেয়া হল, কেউ বাণিজ্যিকভাবে কোয়েল পালন করতে চাইলে কারিগরি জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়।

পোস্টটি শেয়ার করুন এবং এই সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় আপডেট থাকতে আমাদের পেজে লাইক দিয়ে একটিভ থাকুন, ভাল থাকুন সবাই।
ফেসবুকে কমেন্টস করতে, আপনার ফেসবুকে লগইন থাকতে হবে-

Share this post for your friend (সবার জন্য এই লিংকটি শেয়ার করুন)

PinIt
শুধু পাঠক হিসাবে নয় আমরা আপনাকে চাই একজন শিক্ষক ও লেখক হিসাবে। প্রয়োজনীয় ছবি সহ আমাদেরকে লিখুন ইমেইলে- etipsbdinfo@gmail.com