আমার মনে পড়া দুরন্ত সব স্মৃতিগুলো-২

আমাদের অভাবের সংসার। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। কিন্তু শারিরিক গঠন এমন ছিল কেউ বিশ্বাস করতনা আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি, সবাই বলত টু/থ্রিতে পড়ি। বাবা দূরে থাকায় এই ছোট বেলা থেকেই সংসারের অনেক গুরত্তপুর্ন সব কাজ আমাকেই করতে হত। বাড়িতে ভাত খাবার চাল নেই আর সেদিন।
mahin's memory-2

শুক্রবারের আমবাড়ি হাটের সেই দিনে মা আমাদের একটি খাসি ছাগল হাটে নিতে বলেন এবং সেই টাকা দিয়ে চাল ও অন্যান্য কিছু কিনতে বললেন আমাকেই। প্রথমে ভয় পেলাম, আমি ছাগল বিক্রি করতে পারব? না পেরে ত উপায়ও নেই। সাহস করে ছাগল নিয়ে গেলাম হাটে। আমি এত পিচ্চি যে, আমার কাছ থেকে কেউ ছাগল নেয়না। আমি ছাগলের দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছি। একজন অপরিচিত লোক এসে আমার হাত থেকে ছাগল নিয়ে বললো আমি তর ছাগল বিক্রি করে দেই। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার ছাগল বিক্রি করে সে টাকা নিয়ে নিল। এখন আমাকে বল্লো তর ছাগল বিক্রি করে দিলাম আমাকে কিছু দিবিনা? আমি বললাম ১০ টাকা নেন এখান থেকে, সে বললো ১০ টাকা ত আমি হাটের চাদাই দিলাম, আমি বললাম তাহলে ২০ টাকা নিয়ে বাকি টাকা আমাকে দেন। এবার সে বলল টাকা ভাংতি করে নেই তাহলে। আমি বললাম ঠিক আছে ভাই তাড়াতাড়ি করেন। সে এখন টাকা ভাংতি করার নামে পুরো হাট দুবার ঘুরাল আমাকে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফন্দি করতে থাকে, একবার বলে তুই এখানে দাড়া আমি টাকাটা ভাংতি করে নিয়ে আসি, তুই ছোট মানুস দেখে কেউ ভাংতি দেয়না। আমি বললাম না আপনি যেখানে জাবেন আমি সেখনেই যাব। এভাবে সে কয়েকবার করে আমাকে বোঝালো, একবার আমি বললাম জান আপনি ভাংতি করে নিয়ে আসেন আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি। লোকটা তাড়াতাড়ি করে সামনে চলে গেল, আমিও লুকিয়ে তার পিছে পিছে চলে গেছি লোকটি বুঝতে না পেরে চলে জেতে লাগলো। আমি আবার লোকটার শার্ট ধরলাম, বললাম টাকা ভাংতি করলেন? লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে অনেক্ষন থেকে বলল চল হোটেলে কিছু খাই, তারপর ভাংতি হয়ে যাবে। আমি বললাম চলেন, তারপর ১৩ টাকার খুরমা খেয়েও ৫০০ টাকাটা ভাংতি করা গেলনা। এবার সে হাট থেকে আধা কিলোমিটার দূরে নিয়ে গেল আমাকে, বলল তুই এখানে দাড়া আমি ২ নং (হাগু) সেরে আসি। আমি বললাম আমি (হাগু) করব। লোকটা আমাকে গালি দিল, বলল তুই ত অদ্ভুত চেংড়া হে। আমি বললাম আমাকে টাকাটা দেন। পরে আমাকে বলল এই টাকা দিয়ে কি করবি? আমি বললাম- বাসায় কিচ্ছু খাবার নেই, আজ চাল কিনব তারপর বাড়িতে ভাত রান্না করবে মা। বাসায় কিছু পুরান আতপ চাল ছিল সেগুলো দিয়ে আজ ভাত রান্না করে খেয়ে বাজারে আসছি, বাসায় আর কোন চাল নেই। তখন সে আবার হাটের ভিতর নিয়ে গেল, আবার পুরা হাট ঘুরালো আমাকে নিয়ে। আমি তার শার্ট ধরে হাটতেছি ( একবারো তার শার্ট ছাড়িনাই)। মাঝে মাঝে হাটে আমাদের গ্রামের লোকজন দের সাথে দেখা হচ্ছে কিন্তু কাউকে কিছু বলিনাই, কারন লোকটি আমাকে আগেই বলেছিল কাউকে বলবিনা যে, আমি তর টাকা নিছি। তাই গ্রামের পরিচিত মানুস মনে করছে, আমি আমার মামার সাথে হাত ধরে হাটতেছি। লোকটি আবার আমাকে নিয়ে হাটের আধা কিলোমিটার দূরে নিয়ে আসলো, এবার আমাদের বাড়িতে আসতে চাইলো। আমি বললাম চলেন আমাদের বাড়িতে দেখেন আমাদের বাড়িতে কোন চাল নেই খাবার, বলতে বলতে আমার চোখে পানি আসলো। এবার লোকটি আমাকে ধমক দিয়ে বলল এই কাদবিনা, একদম কাদবিনা। আমি তার শার্ট ধরেই আছি, কোন সময় ছেড়ে দেয়না তার শার্ট। এবার ২৭ টাকা কেটে নিয়ে আমাকে পুরো টাকা দিয়ে বলল- যাহ্ বাড়ি যা। আমি সোজা বাড়িতে এসে মাকে পুরো ঘটনা বললাম। মা বলল- আল্লাহ পাক আমাদের বাচাইছেন দালালের খপ্পর থেকে। সেদিনই জানলাম গরু-ছাগলের হাটে দালাল নামে কোন মানুস থাকে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন