রামসাগর-বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট বৃহত্তম দীঘি

ramsagor

রামসাগর এর ছবি। ছবি- সংগ্রহীত

রামসাগর- নামের শেষে সাগর থাকলেও এটি আসলে একটি দীঘি। তবে বিশালতায় অনেকটা সাগরের মতোই। অন্যান্য দীঘি থেকে এটিকে আলাদা করে দেখার আরো অনেক কারণ রয়েছে। এটি দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলার তাজপুর গ্রামে অবস্থিত মানবসৃষ্ট বৃহত্তম দীঘি। শুধু তাই নয়, এ দীঘিটি দেশের প্রাচীন দীঘিগুলোর একটি। দিনাজপুর জেলার তাজপুর গ্রামে অবস্থিত মানবসৃষ্ট দীঘি। এটি বাংলাদেশে মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় দিঘি। রামসাগর দিঘি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা আকৃতির। এর উত্তর দিকটি অপেক্ষাকৃত বেশি গভীর। বেশ কয়েকটি পাকা ঘাট থাকলেও প্রধান ঘাটটি পশ্চিম পাড়ের ঠিক মাঝ বরাবর অবস্থিত। তটভূমিসহ রামসাগরের আয়তন ৪,৩৭,৪৯২ বর্গমিটার, দৈর্ঘ্য ১,০৩১ মিটার ও প্রস্থ ৩৬৪ মিটার। গভীরতা গড়ে প্রায় ১০ মিটার। পাড়ের উচ্চতা ১৩.৫ মিটার। দীঘিটির পশ্চিম পাড়ের মধ্যখানে একটি ঘাট ছিল যার কিছু অবশিষ্ট এখনও রয়েছে। বিভিন্ন আকৃতির বেলেপাথর স্ল্যাব দ্বারা নির্মিত ঘাটটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ছিল যথাক্রমে ৪৫.৮ মিটার এবং ১৮.৩ মিটার। দীঘিটির পাড়গুলো প্রতিটি ১০.৭৫ মিটার উঁচু। ঐতিহাসিকদের মতে, দিনাজপুরের বিখ্যাত রাজা রামনাথ (রাজত্বকাল: ১৭২২-১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ) পলাশীর যুদ্ধের আগে (১৭৫০-১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে) এই রামসাগর দিঘি খনন করেছিলেন। তাঁরই নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় রামসাগর। দিঘিটি খনন করতে তৎকালীন প্রায় ৩০,০০০ টাকা এবং ১৫,০০,০০০ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়েছিল। দিনাজপুর পার্বতীপুর রেলস্টেশন থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত। ১৯৬০ সালে দীঘিটিকে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আনা হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে একে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল রামসাগরকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে কিছু পিকনিক স্পট এবং শিশুপার্ক। দিঘিটির চারপাশ গাছে গাছে ঢাকা। মাঝ দিয়ে হাঁটার জন্য আছে ইট বাঁধানো পথ। আর রয়েছে ছোট ছোট কয়েকটি টিলা। পশ্চিম পাশে ছোট্ট একটি চিড়িয়াখানাও আছে।দিঘির উত্তর দিকে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত লাল ইটের একটি প্রাচীন স্থাপনা দেখা যায়। এটি নিয়ে নানা কথা প্রচলিত আছে স্থানীয়দের কাছে। কারও মতে এটি একটি মন্দির আবার কারও মতে এটি ছিল রাজাদের বিশ্রামাগার।

রামসাগর নিয়ে শোনা লোককথা
এই দিঘি নিয়ে প্রচলিত আছে বিভিন্ন লোককথা। কথিত আছে, ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রচণ্ড এক খরা দেখা দিলে পানির অভাবে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে হাজার হাজার প্রজা। এসময় দয়ালু রাজা প্রাণনাথ স্বপ্নাদেশ পেয়ে একটি পুকুর খনন করেন। মাত্র ১৫ দিনে এর খনন কাজ সম্পন্ন হয়। কিন্তু সেই পুকুর থেকে পানি না ওঠায় একসময় রাজা স্বপ্নে দৈববাণী পেলেন যে, তাঁর একমাত্র ছেলে রামকে দীঘিতে বলি দিলে পানি উঠবে। রাজা সবাইকে ডেকে তার স্বপ্নাদেশ শোনালেন। রাজা চাইছিলেন না তার ছেলেকে হারাতে। কিন্ত রাজকুমার রাম নির্ভীকভাবে প্রজাদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে রাজি হন। স্বপ্নাদিষ্ট রাজা, দীঘির মাঝখানে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেন। তারপর এক ভোরে যুবরাজ রামনাথ সাদা পোষাকাচ্ছাদিত হয়ে হাতির পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন সেই দীঘির দিকে। দীঘির পাড়ে পৌঁছে যুবরাজ রাম সিঁড়ি ধরে নেমে গেলেন মন্দিরে। সঙ্গে সঙ্গে দীঘির তলা থেকে অঝোর ধারায় পানি উঠতে লাগল। চোখের পলকে যুবরাজ রামনাথসহ পানিতে ভরে গেল বিশাল দীঘি। দীঘির পানিতে তলিয়ে যায় রাজকুমারের মৃতদেহ। রাজকুমার রামের নামানুসারেই দীঘিটির নামকরণ করা হয় ‘রামসাগর’।

আরও একটি লোককাহিনী শোনা যায়। দিঘি খনন করার পর রাজা রামনাথ পানি না উঠলে স্বপ্ন দেখেন রাজা দিঘিতে কেউ প্রাণ বিসর্জন দিলে পানি উঠবে। তখন রাম নামের স্থানীয় এক যুবক দিঘিতে প্রাণ বিসর্জন দেয়। পরবর্তিতে রাজার নির্দেশে সেই যুবকের নামে দিঘির নামকরণ করা হয় রামসাগর।

কিন্তু এ কথিত লোককথার সত্যতা কতটুকু তা জানা নেই। তবে ঐতিহাসিকদের মতে এই দীঘির ইতিহাস একটু অন্যরকম। তাদের দাবি, দিনাজপুরের বিখ্যাত রাজা রামনাথ এই দীঘি খনন করেন। রামনাথ ছিলেন দিনাজপুর রাজবংশের শ্রেষ্ঠতম রাজা। তিনি ১৭২২ সাল থেকে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত দিনাজপুরে রাজত্ব করেন। দিনাজপুর রাজবংশের ইতিহাসের মতে, ১৭৫০ থেকে ১৭৫৫ সালের মধ্যে অর্থাৎ পলাশীর যুদ্ধের পূর্বে রামসাগর দিঘি খনন করা হয়।

যাবেন যেভাবে
সড়ক ও রেলপথে সরাসরি দিনাজপুর আসা যায়। ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী বাসগুলো সাধারণত ছাড়ে গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে। এ পথে নাবিল ও হানিফ পরিবহনের এসি বাস চলাচল করে। ভাড়া ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা। এ ছাড়া হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এস আর ট্রাভেলস, কেয়া পরিবহন, এস এ পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, নাবিল পরিবহনের নন-এসি বাসের ভাড়া ৫৫০-৬৫০ টাকা। এছাড়া ট্রেনেও যাতায়াত করা যায়। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন দ্রুতযান এক্সপ্রেস ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে । আর আন্তঃনগর একতা এক্সপ্রেস ছাড়ে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে । দিনাজপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে দ্রুতযান এক্সপ্রেস ছাড়ে সকাল ৮টা ১০ মিনিটে আর একতা এক্সপ্রেস ছাড়ে রাত ৯টা ৫০ মিনিটে। ঢাকা থেকে একতা ও দ্রুতযান এক্সপ্রেস বন্ধ থাকে যথাক্রমে মঙ্গল ও বুধবার। আর দিনাজপুর থেকে বন্ধ থাকে যথাক্রমে সোমবার ও বুধবার। ভাড়া শোভন সিট ৩৬০ টাকা। শোভন চেয়ার ৪৩০ টাকা। প্রথম শ্রেণি চেয়ার ৫৭০ টাকা। স্নিগ্ধা শ্রেণি ৬৭০ টাকা। প্রথম শ্রেণি বার্থ ৮৫৫ টাকা এবং এসি বার্থ ১২৮৫ টাকা। (ট্রেনের সময় ও ভাড়া পরিবর্তন হতে পারে, দয়া করে জেনে নিবেন)।

সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে রামসাগর জাতীয় উদ্যান। প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২ টাকা। নির্দিষ্ট মূল্য পরিশোধ করে গাড়ি নিয়েও জায়গাটিতে প্রবেশ করা যায়। নিজস্ব বাহন না থাকলে দিনাজপুর শহর থেকে ব্যাটারি চালিত রিকশায় রামসাগর আসতে সময় লাগে প্রায় ত্রিশ মিনিট। শহর ছেড়ে মাশিমপুর ও আউলিয়াপুরের লিচু বাগান দেখতে দেখতে চলে আসা যায় বিরাট এ দিঘিটি দেখতে।

যেথায় থাকবেন
দিনাজপুর শহরে থাকার জন্য ভালো মানের হোটেল হচ্ছে পর্যটন মোটেল। ঢাকায় পর্যটনের প্রধান কার্যালয় থেকেও এ মোটেলের বুকিং দেওয়া যায়। এ ছাড়া দিনাজপুরের অন্যান্য সাধারণ মানের হোটেলে ৩০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় থাকা যায়। এরকম কয়েকটি হোটেল হল- মালদহ পট্টিতে হোটেল ডায়মন্ড। নিমতলায় হোটেল আল রশিদ, হোটেল নবীন, হোটেল রেহানা, নিউ হোটেল ইত্যাদি ছাড়াও আরো কিছু হোটেল পাওয়া যাবে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন